হঠাৎ এক অন্য রকম ভ্রমণে ইতালিতে

হঠাৎ কোথাও আকস্মিকভাবে রওনা দেওয়া আমার অভ্যাস, তা–ও পরিকল্পনা ছাড়া। হোক না সে দূরের বা কাছের। ২০২৩ সালের জানুয়ারির এক সোমবার, ছেলে জোনাথন টেনিস ট্যুরে তিউনিসিয়ায়। মেয়ে জেসিকা দুই দিনের অফিসিয়াল কাজে প্যারিসে এবং স্ত্রী মারিয়া অফিসে, আমি নিজের জগতে।

বড় ভাই ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সপ্তাহ ধরে বেশ কিছু পিএইচডি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদানে গিয়েছেন ইতালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাকে সকালে ফোন করে বললেন, এবার পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণে আমরা অ্যাপ্লাই করছি লার্নিং ফ্রম লার্নার এবং লার্নিং বাই ডুইং কনসেপ্ট। আমি ডেমোন্সট্রেট করতে চাই কি না, জানতে চাইলেন। ভাবলাম তা করা যেতে পারে। ব্যস আর দেরি নয়, ঝটপট করে টিকিট কিনতেই একটু জটিলতা দেখা দিলো। সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। কী করি? ভাবলাম একটু ভিন্ন ধরনের জার্নি হোক তাহলে। সে আবার কী? কথায় বলে এক গুলিতে ছয় বাঘ, তেমনটি হলো। মারিয়া কাজ থেকে বাসায় আসতেই বললাম, আমি আজই বাড়ি ছাড়ছি, ফিরব বৃহস্পতিবারে। মারিয়া বলল তোমার বন্ধু আসবে লন্ডন থেকে আর তুমি বাড়ি ছাড়বে সে কি? বললাম, তারা আসবে শুক্রবারে আমি ফিরব বৃহস্পতিবার রাতে। স্টকহোম বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছি।

বিমানবন্দরের বাসে বসে ছোট ভাই শাহীন থাকে লন্ডনের লাইম হাউসে। তাকে ফোনে বললাম, রাতে ডিনারের ব্যবস্থা কর আমি আসছি। ছোট মাছ যেন থাকে। তার স্ত্রী রান্না করে ভালো। ও একটু অবাক হলো প্রথমে। তবে জানে এমন ধরনের ঘটনা আমি ঘটিয়ে থাকি, তাই বিষয়টি তার জন্য নতুন কিছু না। তাছাড়া সন্ধ্যায় সবাই বাসাতে থাকবে, তার পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা হবে। ল্যান্ড করলাম লন্ডন গ্যাটউইকে। পরে ট্রেনে করে এলাম লন্ডন ভিক্টোরিয়া ট্রেন স্টেশনে এবং শাহিনের সঙ্গে দেখা হলো ভিক্টোরিয়া স্টেশনে।

একসঙ্গে তাঁর বাড়িতে পৌঁছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। শাহিনের ছেলে-মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। বাড়িতে ঢুকে ডিনার শেষে কথাবার্তা সেরে ঘুমাতে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার সঙ্গে দেখা করে সকালের নাশতা সেরে ওরা স্কুল এবং কাজে রওনা দিলো; আমিও চলে গেলাম বিমানবন্দরে। চেকিং পর্ব শেষে ঢুকে গেলাম প্লেনে, ইতালির পিসার উদ্দেশে।

সিটে বসতেই পাশে একজন ছেলে এসে হাজির। বেশ ফিটফাট ও স্মার্ট। সাজিয়ে–গুছিয়ে কথা বলতেই তাঁর ভাবভঙ্গি কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলো। ছেলেটি নিজেই তাঁর পরিচয় জানিয়ে দিলেন যে তিনি সমকামী। তিনি ক্রমেই আমাকে অবাক করতে শুরু করলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এই প্রথম বিয়ের পর স্বামী ছাড়া ট্রাভেল করছি।’ স্বামী? পরে জানলাম, ‘সমকামীদের মধ্যেও স্বামী-স্ত্রী রয়েছেন।’ তাঁর কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি—সব কিছুতেই মেয়েলি ভাব রয়েছে, শুধু চেহারা ছাড়া। কেন যেন মনে হলো সুযোগ যখন হয়েছে, দেখি কতদূর কি জানা যায়। প্রশ্ন করতেই সব বলতে শুরু করলেন কোনো রকম জড়তা ছাড়া। বয়স ২২ বছর। নাম রেন্টাল। পেশায় ফটো মডেল।যাচ্ছেন ইতালির একটি শহর মিলানে। জন্মসূত্রে তিনি নিকারাগুয়ান। বাবা আমেরিকান। ১৪ বছর বয়সে তাঁর মা গর্ভবতী হন। বাবা তাঁর মাকে ছেড়ে নিরুদ্দেশ হন। মা তাঁকে নিয়ে মুভ করেন মিয়ামিতে। রেন্টালের বয়স আট বছর হতেই তাঁর মা এক ধনী ইতালিয়ানকে বিয়ে করে পাড়ি জমান ইতালিতে। রেন্টাল প্রথম থেকে জানতেন যে তিনি সমকামী। তবুও তিনি চেষ্টা করেছেন অন্য ছেলেদের মতো চলাফেরা করতে। কিন্তু তাঁর কথায় তিনি তাঁর জন্মের শুরুতেই সমকামী। যা তাঁর মা জানতে পারেন রেন্টালের বয়স যখন ১৮ বছর। রেন্টাল ইতালির হাইস্কুল শেষে লন্ডনে পড়াশোনা করতে ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে মুভ করেন। পরে সেই কলেজের এক শিক্ষকের প্রেমে পড়েন। ২০ বছর বয়সে বিয়ে করেন সেই কলেজের এক ইংরেজির শিক্ষক টমাসকে। দুই বছর হলো তাঁরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করছেন ব্রাইটনে।

গল্প শেষ না হতেই ল্যান্ড করলাম পিসায়। রেন্টাল বিদায় নিয়ে চলে গেলেন মিলানের পথে। আর আমি ট্যাক্সি নিয়ে হোটেল বোলোনিয়ায় আসতে আমার ভাবনায় এসেছিল রেন্টাল এবং তাঁর জীবনের কথা। তাঁর কথায় মনে হলো, তিনি তাঁর জীবনের ভ্যালু খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর সমাজে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। কী অবস্থা তাঁদের, যাঁদের সমাজে এমনটি ভাবনাতেও নেই যে তাঁরা সমাজে সমকামী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারেন, বিয়ে তো পরের কথা এবং রয়েছেন নিশ্চিত হাজারো রেন্টাল পৃথিবীর অনেক দেশে!

যাহোক আমি হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে ডিনারের জন্য চলে এলাম লবিতে। সেখানে দেখা হলো বড় ভাই মান্নান মৃধা এবং তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে। আলোচনার শুরুতে জানতে পারলাম, তাঁদের যৌথ প্রশিক্ষণের বর্ণনা। ১২টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে তাঁদের এই ইইউ প্রজেক্ট। দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সুইডেন, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল, এস্তোনিয়াসহ কয়েকটি এবং প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য, লার্নিং ফ্রম লার্নার, লার্নিং বাই ডুইং অ্যান্ড লার্নিং ফ্রম ইচ আদার।

এবারের কোর্সে পিএইচডি শিক্ষার্থী ২০ জন। তাঁদের সবার সেশনে রয়েছে থিওরি এবং লাঞ্চের পরে রয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে ডেমোনেস্ট্রেশন। তাঁদের শিক্ষায় রয়েছে গ্লোবালাইজেশন এবং একে অপরের থেকে জানা ও শেখার সমন্বয়। বর্তমান গ্লোবাল বিশ্বে চাকরির ক্ষেত্রে এ ধরনের চাহিদা রয়েছে বিধায় ইইউ এই ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করেছে।

সব শুনে মনে হলো, সাধারণ শিক্ষাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা কি এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে? সম্ভব হবে কি ইইউর টপ চাকরিগুলো পাওয়া? যাহোক আমার শিক্ষার ওপর লেখার কনসেপ্টের হুবহু মিলের কারণে সন্ধ্যাটি ছিল মনোমুগ্ধকর। বেশ রাত হয়ে গেল সবাই সকালে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তাই চলে এলাম হোটেলে এবং বেশ একটি টানা ঘুম দিতে অ্যালার্ম বেজে উঠল। ব্রেকফাস্ট সেরে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম ঠিকই, তবে দুজনে দুই ভিন্ন জায়গায়।

মান্নান ভাই গেলেন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আমি গেলাম পিসা ট্যুরে। আরনো নদীর পাড় দিয়ে চলে গেলাম লিনিং টাওয়ার দেখতে। পরে বেশ খোঁজাখুঁজির পর পেলাম দেখা গ্যালিলিওর স্টুডিওর। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও যিনি আবিষ্কার করেছেন টেলিস্কোপ। লিনিং টাওয়ার থেকে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন গ্র্যাভিটির ওপর। তিনি বলেন. পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তিনি জন্মগ্রহণ এবং পড়াশোনা করেছেন এই পিসা শহরে। কীভাবে তাঁর শহর না দেখে ফিরে আসি সুইডেনে! সব কিছু শেষে সন্ধ্যায় দেখা হলো মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে। প্রশিক্ষণের ওপর আলোচনার সঙ্গে ডিনার পর্ব শেষে ফিরে এলাম হোটেলে। সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে ট্যাক্সিতে করে পিসা বিমানবন্দর থেকে রওনা দিয়েছি সিসিলিয়া আইল্যান্ডের কাতানিয়া বিমানবন্দরের উদ্দেশে।

সিসিলিয়া ইতালির অন্য একটি শহরে। এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট পরে ল্যান্ড করলাম কাতানিয়া বিমানবন্দরে। ল্যান্ড শেষে লাঞ্চ সেরে পরের ফ্লাইটে বার্লিন এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পরে এসে হাজির হলাম স্টকহোম আরল্যান্ডা বিমানবন্দরে। বাড়িতে পৌঁছাতে আজ সারা দিন কেটে গেল। পাঠক, এবারের জার্নির মূল উদ্দেশ্য ছিল এ বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণের কনসেপ্টের ওপর মূল্যায়ন করা যা সত্যি ‘ক্রিয়েট সাম রিয়েল ভ্যালু’।
এবারের প্রশিক্ষণ গড়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সমন্বয় এবং সর্বোপরি গ্লোবাল সিঙ্ক্রোনাইজেশন যা পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে উপলব্ধি করেছেন।

অধ্যাপক মান্নান মৃধার দলের পরবর্তী গোলস অ্যান্ড অবজেকটিভ হবে এ ইইউ-প্রজেক্টের মাধ্যমে বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণ চালু করা ইউরোপের এবং বিশ্বের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধে৵ যাতে গোটা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশিক্ষার সমন্বয় ঘটে। আজ এসব কথা লিখতে আমার ভাবনায় ঢুকেছে। কবে হবে এমনটি বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশিক্ষণে?

যেখানে জানার জন্য হবে শেখা এবং সুশিক্ষাই হবে বাংলাকে সোনার বাংলা করার চাবিকাঠি! ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। আর কত দিন দেখতে হবে বিশ্বের রাস্তাঘাটে ফেরিওয়ালা বাঙালি ভাইদের? যাঁদের ভালোবাসার সহধর্মিণী রয়েছেন বাংলাদেশে। যাঁদের আদরের ছেলেমেয়ে রয়েছে দেশে। আর তাঁরা কর্মসূত্রে বাস করছেন দূর পরবাসে পৃথিবীর নানা প্রান্তে শুধু বেঁচে থাকার কারণে।

সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে শুধু সঠিক এবং সুশিক্ষা। তাই আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই প্রিয় দেশবাসীকে, বলতে চাই রাষ্ট্রকে—শাসনতন্ত্র নয়, দুর্নীতিমুক্ত গণতন্ত্র, সঙ্গে সু এবং সঠিক শিক্ষার সমন্বয়ে বাংলাকে গড়ে তোলা হোক সোনার বাংলায়, নিজের এবং দেশের স্বার্থে।

পূর্বের খবরপর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহী সংযুক্ত আরব আমিরাত
পরবর্তি খবররাজধানীতে হাজার বোতল ফেনসিডিলসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার