সৌদি শ্রমবাজার : অন্যের লাইসেন্সে কর্মী প্রেরণ!

খাবার সরবরাহের কাজের কথা বলে সৌদি আরবে ৬০ জন কর্মী পাঠিয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সি ট্রাস্ট কর্নার ওভারসিজ। কিন্তু এই এজেন্সি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা রিক্রুটিং এজেন্সি পাবলিক কেয়ার ওভারসিজের (আরএল-২০৪২) লাইসেন্স ব্যবহার করে কর্মীদের পাঠিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কর্মীরা প্রত্যেকে চার লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যান।

খাবার সরবরাহের কাজের কথা বলে সৌদি আরবে ৬০ জন কর্মী পাঠিয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সি ট্রাস্ট কর্নার ওভারসিজ। কিন্তু এই এজেন্সি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা রিক্রুটিং এজেন্সি পাবলিক কেয়ার ওভারসিজের (আরএল-২০৪২) লাইসেন্স ব্যবহার করে কর্মীদের পাঠিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কর্মীরা প্রত্যেকে চার লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যান।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) বরাবর অভিযোগ করেছেন কর্মীরা। যে দুই রিক্রুটিং এজেন্সি এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তারা কর্মীদের এই দুরবস্থার ব্যাপারে কোনো দায় নিচ্ছে না। পরস্পরের ওপর দোষ চাপাচ্ছে তারা।

কর্মীদের অভিযোগ

চলতি বছরের মার্চে সৌদি আরবে কাজ করতে যান নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার মুন্সিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাহির তাজোয়ার খান মর্ম।এ জন্য তিনি রিক্রুটিং এজেন্সি ট্রাস্ট কর্নার ওভারসিজকে চার লাখ ৭০ হাজার টাকা দেন। মর্ম জানতেন, সৌদি আরবে যাওয়ার পর তিনি ১৭ হাজার রিয়াল বেতনে রেস্তোরাঁয় খাবার সরবরাহের কাজ পাবেন। কিন্তু সেই কাজ তো তিনি পেলেনই না, উল্টো যাওয়ার এক মাস পর থেকে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে।

এক পর্যায়ে মর্ম সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরতে চান। সে সময় তাঁকে ১৫ হাজার রিয়াল মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসতে হয়, যা বাংলাদেশি টাকায় চার লাখ ৭২ হাজার টাকা।দেশে এসে বিএমইটি বরাবর এ বিষয়ে অভিযোগ করেন মাহির তাজোয়ার খান মর্ম।

লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব যাওয়ার পর জেদ্দার একটি বাসায় আমাকে রাখা হয়। সেখানে প্রতিদিন দুই বেলা ভাত ও ডাল খেতে দেওয়া হতো। এভাবে এক মাস পার হওয়ার পরও আমাকে আমার কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। একদিন হঠাৎ বাসার সুপারভাইজার আমাকে তাঁর রুম পরিষ্কার করতে বলেন। আমি প্রতিবাদ করে আসল কাজটা বুঝে পেতে চাই। এতে তিনি আমাকে গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতন করেন। সুপারভাইজার আমাকে জানিয়ে দেন, আমি কাজ পাব না।’লিখিত অভিযোগে মাহির তাজোয়ার খান মর্ম বলেন, ‘আমি দেশে ফিরতে চাইলে সুপারভাইজার আমার পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেন এবং ১৫ হাজার রিয়াল দাবি করেন। বিষয়টি আমার পরিবারকে জানাই। আমার পরিবারের পক্ষ থেকে তখন ট্রাস্ট কর্নারের স্বত্বাধিকারী মিনহাজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্রুত এ সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন। সুপারভাইজার আমার পরিবারের যোগাযোগের দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে আমাকে একটি গাড়িতে করে আরেক জায়গায় নিয়ে যান। সেখানে উপস্থিত সবাই মিলে আমাকে গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। আমাকে তারা বলে, এখান থেকে মুক্তি পেতে হলে ১৫ হাজার রিয়াল দিয়েই মুক্তি পেতে হবে। নইলে তারা আমাকে পুলিশে দেবে।’

কালের কণ্ঠকে মর্ম বলেন, ‘এ ব্যাপারে এজেন্সি আমাকে কোনো সাহায্য করেনি এবং ব্যবস্থাও নেয়নি। আমি দেশে ফেরত আসার পরে যখন ক্ষতিপূরণ চেয়েছি, তখন তারা বলেছে ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে না। তারা সেখানকার লোকদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। তারা প্রলোভন দেখিয়ে অনেক কর্মীকে আটকে রেখেছে। তারা সবাই এই চক্র থেকে মুক্তি পেতে চায়।’

মর্ম থেকে জানা যায়, সেখানে এই রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া আরো প্রায় ৬০ জন কর্মী এভাবে আটকে রয়েছেন। না পাচ্ছেন কাজ, না পারছেন দেশে ফিরে আসতে। তাঁদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছে কালের কণ্ঠ। এঁদের একজন কুমিল্লা সদর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাকিব।কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, “আমরা যখন দেশ থেকে আসি, আমাদের বলা হয়েছিল আমরা তাঁর রেস্টুরেন্টে কাজ করব। আমাদের ১০ ঘণ্টা কাজ করতে হবে। আমাদের এক হাজার ৮০০ রিয়াল বেতন দেবেন। কিন্তু আজকে তিন মাস ধরে তাঁরা শুধু বসিয়ে রাখছেন, কোনো কাজ দেন না। যখনই কাজ চাই তখনই বলেন, ‘হবে, এখন আমরা যা বলি, তা করো।’ তাঁদের কাজ না করতে চাইলেই নির্যাতন শুরু করে দেন। আমরা এই জায়গা থেকে মুক্তি চাই।”‘আমরা বাড়ি যেতে চাইলে বলেন ১৫ হাজার রিয়াল দিয়ে বাড়ি যেতে হবে। আমাদের এত রিয়াল দেওয়ার সাধ্য নেই। একটা বিপদের মধ্যে পড়ে গেছি।’

অন্য এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার

রিক্রুটিং এজেন্সি ট্রাস্ট কর্নার ওভারসিজের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে কালের কণ্ঠ জানতে পারে, এই রিক্রুটিং এজেন্সির কোনো লাইসেন্স নেই। এখন প্রশ্ন হলো, লাইসেন্স না থাকলে কিভাবে তারা বিএমইটির ছাড়পত্র পেল?মর্ম জানান, তাঁদের বিএমইটির সব কাগজপত্র হয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সি পাবলিক কেয়ার ওভারসিজের নামে। কেন তারা আরেক এজেন্সির লাইসেন্সে ছাড়পত্র নিল—জানতে চাইলে মর্ম বলেন, ‘ট্রাস্ট কর্নার থেকে আমাকে বলা হয়েছিল যে যাদের লাইসেন্স নেই তারা পাবলিক কেয়ার ওভারসিজের মাধ্যমে কর্মী পাঠিয়ে থাকে। পাবলিক কেয়ার ও ট্রাস্ট কর্নার একসঙ্গে কাজ করে বলে ট্রাস্ট কর্নার থেকে জানানো হয়েছিল।’

দায় নিচ্ছে না কেউ

যেহেতু এক এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে আরেক এজেন্সি কর্মী পাঠিয়েছে তাই দুজনের কেউই এই কর্মীগুলোর দায় নিচ্ছে না। মর্ম, সাকিবের অভিযোগের সমাধান কী হবে—তা জানতে কালের কণ্ঠ থেকে প্রথমে ট্রাস্ট কর্নারের স্বত্বাধিকারী মিনহাজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন, যাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে কর্মীগুলো গেছেন, তারাই এর দায় নেবে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘তাঁরা তো আসলে আমাদের কর্মী নন। যাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে যান, তারাই সব কিছু করে। এ বিষয় বিএমইটিতে যার নামে আরএল হয়েছে, সে বুঝবে; কর্মীদের যে কম্পানি নিয়েছে, সেই কম্পানি বুঝবে।’

তাহলে কেন অন্য রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে আপনারা কর্মী পাঠালেন—জানতে চাইলে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

রিক্রুটিং এজেন্সি ট্রাস্ট কর্নারের বক্তব্য ধরে কালের কণ্ঠ থেকে পাবলিক কেয়ার ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী সোহেল আহমেদ মিয়াজির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি নিজের ওপর কিছুটা দায় নিলেও কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন—এ দায় আসলে তাঁর নয়। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু ভিসা প্রসেসিং করি। আমরা ভিসা দিই না বা কাউকে ভিসা দিয়ে পাঠাইও না। আমার কাজ ছিল শুধু প্রসেস করে দেওয়া। এরপর কর্মী কাজ পাচ্ছেন নাকি পাচ্ছেন না, এগুলো আমরা জানি না। এখন প্রসেসিংয়ে যখন আমার লাইসেন্স ব্যবহার করা হয়েছে, তখন এটার দায়ভার আমার কাঁধে আসে।’

তবে দায় কার

যেহেতু দুটি রিক্রুটিং এজেন্সি এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাই দুজনকেই এর দায় নিতে হবে বলে জানিয়েছেন বায়রার যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘অভিবাসী আইনের মতে, এই কর্মীগুলো বিএমইটির ছাড়পত্র যে এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে পেয়েছেন, এজেন্সিকেই এর দায়ভার নিতে হবে। তবে আমাদের অনেক রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে, যাদের লাইসেন্স নেই বা সৌদি দূতাবাসের তালিকায় নেই। তারা লাইসেন্সওয়ালা রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স নিয়ে কর্মী পাঠিয়ে থাকে। তখন ওই এজেন্সিকেও দায়িত্বটা নিতে হয়। কারণ যার লাইসেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে, সে আসলে এ বিষয় কোনো তথ্যই জানে না। অর্থাৎ এখানে দুজনকেই দায়িত্ব নিতে হবে।’

আর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে আমাদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন এজেন্সিগুলো যাতে কর্মীবিষয়ক কোনো প্রচারণা করতে না পারে সে বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। এতে কর্মী ভোগান্তি কমে আসবে।’

পূর্বের খবরআমি রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না : কনা
পরবর্তি খবরওয়েস্ট ইন্ডিজের ছক্কা–বৃষ্টিতে উড়ে গেল যুক্তরাষ্ট্র