রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অক্টোবরেই নির্ধারণ

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি অক্টোবরেই নির্ধারিত হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে পর্দার আড়ালে বিভিন্ন পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হোয়াইট হাউজের এক বা একাধিক কর্মকর্তা। সেখানে তাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা হয়েছে কিনা জানা যায়নি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়ে থাকলে তা হবে খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্যে বিদেশে পাঠানোর বিষয়েও অগ্রগতি হচ্ছে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ভাই শামীম ইস্কান্দার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে আইনি দিক খতিয়ে দেখতে আবেদনটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকার বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকারের অনুমতি পেলে খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জার্মানি পাঠানো হতে পারে। খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি রাজনীতিতে ‘গেমচেঞ্জার’ হতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। অপরদিকে, ডলার সংকটসহ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ভোটের পরের পরিস্থিতি নিয়েও পর্যবেক্ষক মহলে আলোচনা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস পরিদর্শন করেছেন। ওই অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউজের এক বা একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা কোনো আলোচনা করতে এখানে আসিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারিবারিকভাবে তার জন্মদিন উদযাপন করেছেন।’ বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিস্তারিত আর কিছু বলেননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভার্জিনিয়ায় তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাসায় আছেন। সেখানে ছেলের সঙ্গে জন্মদিন উদযাপনের পর ৪ অক্টোবর নাগাদ দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ের অবস্থান সম্পর্কে কোনো কোনো মহলের সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করতে সংসদ-সদস্য মুহাম্মদ এ আরাফাত ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিশ্চিত করেছেন যে, জয় ভার্জিনিয়ায় তার নিজের বাসায় মায়ের সঙ্গে আছেন। অপরদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা একাধিক ব্যক্তি যুগান্তরকে জানিয়েছেন, জয়কে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে চালানো প্রচারণা একেবারেই বাজে কথা। তাদের সঙ্গে জয়ের দেখা হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কিনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মনোভাব, অর্থনৈতিক ও মুদ্রা পরিস্থিতিকে অন্যতম ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে সভা-সমাবেশ, রোডমার্চসহ রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। অপরদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংবিধানের আওতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর কর্মসূচির বিপরীতে শান্তি সমাবেশের কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভিসানীতি প্রয়োগ শুরু করেছে। অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচনি মিশন ঢাকায় আসছে। এতে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অগ্রগতি উল্লেখ করার পাশাপাশি আরও করণীয় দিক সম্পর্কে পরামর্শ দিতে পারেন। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এবার ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো অনেকটা একতরফা নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। তবে অর্থবহ নির্বাচন করতে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর দাবির সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন করে সেসব বিষয়ে পর্দার আড়ালে আলাপ-আলোচনা করে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো জরুরি। সমঝোতা হলে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর দাবির মধ্যে বিদেশে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা, রাজবন্দিদের মুক্তি ও রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনায় আসবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। নির্বাচন পরবর্তী সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশেষ করে ডলার সংকটসহ সামষ্টিক অর্থনীতি এবং ২০২৪ সাল থেকে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি নিয়েও পর্যবেক্ষক মহলে আগাম আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক (রাজনৈতিক দল, জনগণসহ সবাইকে নিয়ে) নির্বাচন করার ইতিবাচক প্রস্তুতি দৃশ্যমান হলে আমাদের আন্তর্জাতিক সহযোগী, বন্ধুরা মোটামুটি একটি ইতিবাচক ধারণা নিতে পারবে। যদি তা না হয়, আন্তর্জাতিকভাবে এবং দেশের সাধারণ মানুষ যে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা করছে তা পূরণের প্রেক্ষিত তৈরি হবে না।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমরা অনেক আগেই আমাদের নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছি। অক্টোবরে নেত্রী (আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) দেশে ফিরলে আমাদের নির্বাচনি প্রস্তুতিতে আরও গতি ফিরবে। এর বাইরে আর কিছুই হবে না। কারণ বিএনপি অক্টোবর ঘিরে যেসব হুমকি-ধমকি দিচ্ছে সেগুলোর কিছুই হবে না। তারা গত ১৫ বছর ধরইে এ ধরনের কথাবার্তা বলছে। ফলে তাদের আন্দোলনের হুমকি-ধমকি আমরা আমলে নিচ্ছি না। কারণ তাদের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা নেই। বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ীই যথাসময়ে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অক্টোবরে অবশ্যই একটা কিছু হওয়া উচিত। কারণ ক্ষমতাসীন দল জোর করে নির্বাচন করবে-এটা তো আমরা হতে দেব না। সেজন্যও আমরা তো আন্দোলনে আছি। এ আন্দোলন আগামীতে আরও তীব্র হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ম্যাডাম খালেদা জিয়ার যে শারীরিক অবস্থা, তার যে চিকিৎসা তা তো বাংলাদেশে আর সম্ভব নয়। আমরা উদ্বিগ্ন যে ম্যাডামকে সুস্থ করতে হবে। আমরা চাচ্ছি তাকে যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত বিদেশে পাঠানো হয়। এটাই হলো আমাদের চিন্তা। এখন সরকার কি করবে তা তো তাদের বিষয়।

পূর্বের খবরবহুমুখী সিদ্ধান্তেও সুফল নেই, কমছে রিজার্ভ
পরবর্তি খবরক্রিকেটারকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন পূজা হেগড়ে!