রাজধানীতে দুই দলের বড় শোডাউন কাল

জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান না হওয়ায় ফের উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতি। পর্দার আড়ালে ও প্রকাশ্যে দেশি-বিদেশি শক্তির নানা তৎপরতার পরও সমাধানের কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যার যার অবস্থানে অনড় থাকায় রাজপথেই গড়াচ্ছে রাজনীতি। আগামীকাল রাজধানীতে বড় শোডাউন করবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠেয় সমাবেশ থেকে সরকারপতনের একদফা ঘোষণা করবে বিএনপি। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে শান্তি সমাবেশ করবে ক্ষমতাসীনরা। একইদিনে রাজধানীতে দুই দলের শোডাউন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। কর্মসূচি ঘিরে সাধারণ

বিএনপির একদফা ঘোষণার দিন ঢাকায় শান্তি সমাবেশ প্রথমে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে করার ঘোষণা দেয় ক্ষমতাসীনরা। পরে স্থান পরিবর্তন করা হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে হবে এ সমাবেশ। সেখানে এক লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক জড়ো করার টার্গেট নিয়েছে দলটি। সমাবেশ ছড়িয়ে দেওয়া হবে নবাবপুর, ঠাটারীবাজার, হাইকোর্ট, পল্টন, বিজয়নগর ও দৈনিক বাংলার মোড় পর্যন্ত, এসব এলাকায় টানানো হবে মাইক। আওয়ামী লীগের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা যোগ দেবে এ সমাবেশে। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বক্তব্য দেবেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। শান্তি সমাবেশ সফল করতে সোমবার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতারা সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের দক্ষিণের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সমাবেশ সফল করতে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ আজ ১১ জুলাই কাওরান বাজারের টিসিবি ভবন মিলনায়তনে বর্ধিত সভা আহ্বান করেছে। এই সভায় মহানগর উত্তরের অন্তর্ভুক্ত সব ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। বর্ধিত সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

শান্তি সমাবেশের বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোমবার যুগান্তরকে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এক লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক জড়ো করার টার্গেট রয়েছে। আওয়ামী লীগের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মহানগর নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের অনুরোধ করা হয়েছে এই সমাবেশ সফল করার জন্য। তারা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে শান্তি সমাবেশে যোগ দেবেন। আমরা সোমবার সকালে দক্ষিণের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি।

ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমরা বুধবারের শান্তি সমাবেশে ব্যাপক লোক সমাগমের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আজ উত্তরের বর্ধিত সভায় মহানগরীর নেতাদের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি যুগান্তরকে বলেন, আমরা ভালো একটা সমাবেশ করব। সে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সমাবেশ সফলে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেবে।

সরকারপতনের একদফা ঘোষণাকে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ও বিদেশিদের নজরে আনার পরিকল্পনা নিয়ে সমাবেশ সফলের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এ সমাবেশে মানুষের প্রত্যাশার চেয়ে লোকসমাগম বাড়াতে দিনরাত কাজ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। দফায় দফায় করছেন প্রস্তুতি সভা। ঢাকা বিভাগের সব জেলা থেকে নেতাকর্মীদের উপস্থিত হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমাবেশ সফলে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ। সোমবার মহানগরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে তার বাসায় মতবিনিময় করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনগুলোও ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। সোমবার নয়াপল্টনে প্রস্তুতি সভা করেছে যুবদল ও ছাত্রদল। বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড নেতাদের নিয়ে মতবিনিময় করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদল। এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক আসিফুর রহমান বিপ্লব যুগান্তরকে বলেন, বুধবারের সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি অতীতের রেকর্ড ভেঙে দিতে আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছি। নেতাকর্মীরা নিজের তাগিদেই সমাবেশে অংশ নিতে মুখিয়ে আছে। সরকারকে বিদায় করেই এবার আমরা ঘরে ফিরব। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বুধবারের সমাবেশে অংশ নেবেন বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনও। বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতারা এটা সমন্বয় করছে। রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলো সমাবেশ সফলে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কীভাবে সমাবেশে আসবেন, কোথায় অবস্থান নেবেন তা নিশ্চিত করতে জেলা নেতাদের আলাদা দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন।

জানতে চাইলে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার যুগান্তরকে বলেন, বুধবারের সমাবেশটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারপতনের একদফা ঘোষণা করা হবে। এমন ঐতিহাসিক ক্ষণে গাজীপুর মহানগর থেকে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করছি। অন্তত ২০ থেকে ২৫ হাজার নেতাকর্মী নিয়ে আমরা নয়াপল্টনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। সমাবেশের কথা বলা হলেও ওইদিন নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নেবে বলে আশা করি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের (ডিএমপির) কাছ থেকে সমাবেশের মৌখিক আশ্বাস পেয়েছে বিএনপি। সোমবার দুপুর ২টার দিকে ডিএমপির প্রধান কার্যালয়ে কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের সঙ্গে দেখা করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবুল খায়ের ভুঁইয়া ও শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। এ সময় কমিশনারের কাছে সমাবেশের জন্য একটি লিখিত আবেদন দেন তারা। ডিএমপি কার্যালয় থেকে বেরিয়ে এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, সমাবেশ করতে তাদের মৌখিক আশ্বাস দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করতে পুলিশের সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছি। আশা করি তারা সেটা করবে। সমাবেশের অনুমতি না পেলে বিএনপি কী করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমাদের রাজনৈতিক সমাবেশ। এখানে অনুমতি নেওয়ার কোনো বিষয় নেই। আমরা সহযোগিতা চাইতে এসেছিলাম, তারা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।

সমাবেশের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডে সিএনজি ও রিকশাযোগে প্রচারে মাইক ব্যবহারেরও অনুমতি চাওয়া হয়। সেটাও দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে মাইকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সমাবেশে অংশ নিয়ে তা সফলের আহ্বান জানানো হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর বিএনপির পক্ষ থেকে মাইকে এমন ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়। সমাবেশে নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগানো হয়েছে। এতে লেখা রয়েছে ‘বুধবার, জুলাই ১২, ২০২৩, দুপুরে ঢাকার নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কার্যালয়ের সামনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে সমাবেশ, যোগ দিন সফল করুন।’ বুধবারের সমাবেশ সফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক প্রচার।

এদিকে বুধবারের সমাবেশ থেকে একদফার পাশাপাশি ঘোষণা করা হবে রাষ্ট্র সংস্কারের (ক্ষমতায় গেলে) ৩১ দফার রূপরেখাও। থাকবে সরকারপতনের চূড়ান্ত আন্দোলনের নতুন কর্মসূচিও। বিকাল চারটায় আলাদা মঞ্চ থেকে ৩৬টি দল একযোগে এসব ঘোষণা করবে। শুরুতে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যাচ্ছে না তারা। মানববন্ধন কিংবা মানবপ্রাচীরের মতো কর্মসূচি দিয়েই শুরু হতে পারে একদফার আন্দোলন। যাত্রাবাড়ী থেকে গাবতলী পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালনের চিন্তা রয়েছে। এছাড়া ঢাকায় বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণাও আসতে পারে। শুরুতে নরম কর্মসূচি নিয়েই মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। তবে এখন পর্যন্ত কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়নি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে কোনো আলটিমেটাম দেওয়া হবে না।

একদফার সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচি চূড়ান্তে কয়েকদিন ধরে সমমনা দল ও জোটের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করছে বিএনপি। এ ব্যাপারে তাদের মতামত নেওয়া হয়। সোমবার গণতন্ত্র মঞ্চ, এলডিপি, লেবার পার্টি ও ড. রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা নিয়ে মতৈক্য পৌঁছেছে তারা।

বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ সবকিছু হরণ করে সরকার বিনাভোটে ক্ষমতায় বসে আছে। গণতন্ত্র উদ্ধারে আমাদের আন্দোলন। আগামী দিনের আন্দোলনে আমরা যৌথভাবে এগিয়ে যাব। এখানে সর্বস্তরের জনগণকে সমন্বিত করার উদ্দেশ্যে এই ‘ডাক’ আজকে এখান থেকে দিচ্ছি। সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ আন্দোলনে যোগ দিতে এবং তা সফলে সবার সহযোগিতা চাইব। এজন্য আমরা ওইদিন একটি যৌথ ঘোষণাও দেব।

তিনি বলেন, দেশের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ এ আন্দোলনে শরিক হয়েছে। এবার জনগণের বিজয় হবেই। দেশের ভেতরে ও বাইরে যারা এ আন্দোলনকে সমর্থন করছেন তারা গণতন্ত্রের পক্ষে। যারা বিরোধিতা করছেন তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে। আজ নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সঙ্গে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটি বৈঠক হবে। এর মধ্য দিয়েই শেষ হবে সমমনা দল ও জোটের সঙ্গে মতবিনিময়।

মানুষেরও আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে।

পূর্বের খবরপাসপোর্ট পেতে যাচ্ছে ৬৯ হাজার ‘রোহিঙ্গা’
পরবর্তি খবরছবির জন্য একটি কাজ ছাড়া সব করতে রাজি নার্গিস ফাখরি