বহুমুখী সিদ্ধান্তেও সুফল নেই, কমছে রিজার্ভ

বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বহুমুখী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ডলার আয় উৎসাহিত করতে ও খরচের লাগাম টানতে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করছে। কিন্তু বাস্তবে এর তেমন একটা সুফল মিলছে না। উলটো নানা ধরনের গুজব রটে বাজারে আস্থার সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে। এতে ডলারের দাম বেড়ে টাকার মান কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে দেনা শোধ করার ধারা অব্যাহত থাকায় রিজার্ভের ক্ষয় মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে। তবে আমদানি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু পদক্ষেপের ফলে এখন চলতি হিসাবে ঘাটতি থেকে উত্তরণ ঘটে উদ্বৃত্ত হয়েছে। তারপরও ডলারের সংকট কাটছে না। বরং আরও প্রকট হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়ে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বৈদেশিক অনুদান থেকে। এই চার খাতেই আয়ের ধারা নিম্নমুখী। এর মধ্যে রেমিট্যান্স বাড়াতে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাতে হুন্ডির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার পর ওই দেশ থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে। অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এ ধরনের পদক্ষেপ দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকের চেয়ে কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম প্রায় ৭ থেকে ৮ টাকা বেশি। ফলে রেমিট্যান্সের বড় অংশ চলে যাচ্ছে হুন্ডিতে। মানি চেঞ্জার্স ও কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করলে ওখানে ডলার লেনদেনে স্থবিরতা নেমে আসে। এখন কিছু লেনদেন হলেও দাম ১১৮ থেকে ১১৯ টাকা। মানি চেঞ্জার্সগুলো নির্ধারিত দামে ডলার পাচ্ছে না বলে বিক্রিও কমে গেছে। ফলে এতে ডলারের প্রবাহ তো বাড়েইনি। উলটো কমে গেছে।

ডলারের প্রবাহ বাড়াতে হলে রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে। সেটি সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বৈশ্বিক মন্দায় রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল আমদানি জুলাই-আগস্টে কমেছে ২৮ শতাংশ ও এলসি খোলা কমেছে ১৭ শতাংশ। গত অর্থবছরেও এ খাতে আমদানি ও এলসি দুইই কমেছিল। রপ্তানির আদেশ কম আসায় কাঁচামাল আমদানি কমছে। আগামীতে রপ্তানিকারকরাও আয় নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

জুনে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৫০৩ কোটি ডলার, জুলাইয়ে তা কমে ৪৫৯ কোটি ডলার, আগস্টে সামান্য বেড়ে রপ্তানি আয় এসেছে ৪৭৮ কোটি ডলার। ৩ মাসে এসেছে ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছিল ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বেড়েছিল ২৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছে ৯ দশমিক ১২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ।

জুনে রেমিট্যান্স এসেছিল ২২০ কোটি ডলার, জুলাইয়ে তা কমে ১৯৭ কোটি ডলার, আগস্টে তা আরও কমে ১৬০ কোটি ডলার এসেছে। ৩ মাসের হিসাবে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৭৭ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমেছিল ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। ওই কমার বিপরীতে গত অর্থবছরে বেড়েছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বেড়েছিল ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বাড়ার পরিবর্তে প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

বৈদেশিক অনুদানের গতিও নিম্নমুখী। ২০২১-২২ অর্থবছরে অনুদান বেড়েছিল ৫১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গত অর্থবছরে বাড়ার পরিবর্তে বরং কমেছে সাড়ে ১১ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাইয়ে বেড়েছিল ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমেছে ৩৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। জুন ও জুলাইয়ে অনুদান এসেছে মাত্র ৩২ কোটি ডলার।

বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০২১-২২ অর্থবছরে এসেছিল ১৮৩ কোটি ডলার, গত অর্থবছরে এসেছে ১৬১ কোটি ডলার। তবে জুলাইয়ে বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের ওই সময়ে ১৭ কোটি ও চলতি বছরের একই সময়ে এসেছে ১৮ কোটি ডলার। এর বিপরীতে শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রা খরচের মধ্যে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার পরও তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে শুরু করেছে। ফলে এ খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রায় আরও চাপে পড়বে। জুনে আমদানি ব্যয় হয়েছিল ৪৭৪ কোটি ডলার, জুলাইয়ে ৬১৪ কোটি ডলার, আগস্টে ৫৬২ কোটি ডলার। ৩ মাসে আমদানি ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬১০ কোটি ডলার। ওই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলার ও রেমিট্যান্স এসেছে ৫৭৭ কোটি ডলার। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি মিলে আয় হয়েছে ২ হাজার ১৯৫ কোটি ডলার। এর বিপরীতে আমদানি ব্যয় বাদ দিলে উদ্বৃত্ত থাকছে ৭৪৭ কোটি ডলার। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি কমে গিয়ে এখন উদ্বৃত্ত হচ্ছে। জুলাইয়ে উদ্বৃত্ত হয়েছে ৫৪ কোটি ডলার। বিনিয়োগ ও অনুদান থেকে যেসব ডলার আসছে তার বড় অংশ যাচ্ছে বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসা ও অন্যান্য খাতে। এছাড়া বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা নেওয়া, রয়্যালটি পরিশোধ, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের অর্থ নেওয়া বাবদ আরও ডলার খরচ হচ্ছে। এর বাইরে স্থগিত ঋণ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কমপক্ষে ৬০০ কোটি ডলার শোধ করতে হবে। এসব মিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সার্বিক স্থিতিতে ঘাটতি হচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে ঘাটতি হয়েছিল ৬৬৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৮২২ কোটি ডলার। গত বছরের জুলাইয়ে ঘাটতি ছিল ১০৮ কোটি ডলার। চলতি বছরের একই মাসে তা কিছুটা কমে ১০৭ কোটি ডলার ঘাটতি হয়েছে। এ ঘাটতির কারণে বাজারে ডলার প্রবাহ বাড়ছে না।

ডলারের দাম আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মৌখিক নির্দেশে বাড়ানো হতো। গত বছরের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের চাপে ডলারের দাম বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) মাধ্যমে বাড়ানো হচ্ছে। প্রতি মাসে গড়ে এক টাকা থেকে ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানো হতো। চলতি মাসে দুদফা বাড়ানো হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর রুটিন মাফিক বাড়ানো হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে আরও এক দফা বাড়ানো হয়। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগাম ডলার বেচাকেনার লাগাম টেনে ধরতে নতুন নীতি ঘোষণা করে। ফলে ডলারের আগাম বেচাকেনার ক্ষেত্রে বেঁধে দেওয়া বাজারদরের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ বার্ষিক ভিত্তিতে যোগ করার কথা। অর্থাৎ ৬ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদ ও এর সঙ্গে আরও ৫ শতাংশ যোগ করার কথা। বর্তমানে ট্রেজারির বিলের গড় সুদ ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। বর্তমানে ডলারের দাম ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। এর সঙ্গে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ যোগ করলে এক বছর মেয়াদি আগাম ডলার হবে ১২৪ টাকা। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে গুজব রটিয়ে পড়ে যে ডলার সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। তখন আগাম ডলার কেনার হিড়িক পড়ে যায়। এতে বাজারে সংকট আরও প্রকট হয়। এর ২ দিন পরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক সার্কুলার জারি করে বলে, ৩ বা ১ মাস মেয়াদে ডলার কেনা যাবে। এতে দাম হবে ১১৩ টাকা ৮৫ পয়সা ও ১১১ টাকা ৬০ পয়সা। তবে ওই দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগাম ডলার বেচাকেনা শুধু আমদানিকারকদের মধ্যে সীমিত করে দেয়। এছাড়া ব্যাংক, রেমিট্যান্স হাউজ, রপ্তানিকারকরা আগাম ডলার কিনতে পারবে না। আগে তারা আগাম ডলার বুকিং দিতে পারতেন। ফলে বাজারে আগাম ডলার বেচাকেনা আরও কমে যাবে।

ডলারের আগাম মূল্য কার্যকর হওয়ার কথা সোমবার থেকে। কিন্তু তার আগেই বাফেদা রোববার আমদানিতে ডলারের দাম ৫০ পয়সা বাড়িয়েছে। ফলে ১১০ টাকার সঙ্গে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ যোগ করে আগাম বেচাকেনার দর কার্যকর হয়নি। এটি কার্যকর হওয়ার আগেই ডলারের দাম বাড়িয়ে ১১০ টাকা ৫০ পয়সা করেছে। অর্থাৎ একটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগেই নতুন আরেকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়াতে রপ্তানিকারকদের রিটেনশন কোটা কমিয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। তারা যাতে ডলার ধরে রাখতে না পারে সেজন্য ৩০ দিনের বেশি ডলার রপ্তানিকারক ব্যবহার না করলে গ্রাহককে টাকা দিয়ে তা ব্যাংক নিজ ক্ষমতায় অন্যত্র ব্যবহার করতে পারবে। এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে ডলার স্থানান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের পরেও ডলারের প্রবাহ কতটুকু বাড়বে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে। এসব সিদ্ধান্তের কারণে রপ্তানিকারকরা নানা অজুহাতে রপ্তানি আয় দেশে আনা বিলম্বিত করে দিতে পারেন। তখন রপ্তানি আয়ে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ পণ্যের দাম বাড়ার কারণে ও রপ্তানি আয় কমায় নিজস্ব ডলার দিয়ে রপ্তানিকারকদের চাহিদা মিটছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণও কমে গেছে। এ কারণেও ডলারের প্রবাহ বাড়ছে না। আগে বৈদেশিক ঋণের সুদের হার ছিল কম। এখন বেড়ে যাওয়ায় চড়া সুদে কেউ ঋণ নিতে চাচ্ছে না। লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেট বা লাইবর রেট বেড়ে যাওয়ার কারণে এ তহবিল থেকে ঋণের সুদের হারও বেড়ে গেছে। আগে লাইবর রেটের (৬ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদের হার) সঙ্গে আড়াই শতাংশ যোগ করে ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হতো। করোনার আগে লাইবর রেট ছিল দেড় থেকে ২ শতাংশ। এ হিসাবে ঋণের সুদ হতো ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ। বর্তমানে লাইবর রেট বেড়ে ডলারে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইউরোতে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে ওঠেছে। এর সঙ্গে আড়াই শতাংশ যোগ করলে সুদের হার দাঁড়ায় ডলারে ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ইউরোতে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। ফলে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ কমে গেছে।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশের রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ সর্বোচ্চ গ্রস ৪ হাজার ৮০৬ কোটি ডলারে ওঠেছিল। এখন তা কমে গ্রস হিসাবে ২ হাজার ৭০৬ কোটি ডলার ও নিট হিসাবে ২ হাজার ১১৫ কোটি ডলারে নেমেছে। যা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় ৩ মাসের কিছু বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। রিজার্ভের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকায় আমদানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে।

পূর্বের খবরআরও ১০০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র
পরবর্তি খবররাজনীতির গতি-প্রকৃতি অক্টোবরেই নির্ধারণ