নির্বাচন সামনে রেখে সক্রিয় আন্ডারওয়ার্ল্ড

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ড। রাজনীতির মাঠ অস্থির করতে আগ্নেয়াস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছে পেশাদার সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা। কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় নড়াচড়া শুরু হয়েছে অপরাধজগতে। বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। টপ টেররদের অনেকেই বেশির ভাগ মামলায় জামিন নিয়েছে। ইতোমধ্যেই তাদের কয়েকজন সহযোগী জামিনে বের হয়েছে। বিদেশ থেকেও দেশে আসতে শুরু করেছে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সূত্র জানায়, ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর ১৩ জন দেশের বাইরে এবং ছয়জন কারাগারে অবস্থান করে মাঠ পর্যায়ে সহযোগীদের নানা দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে আছে পিচ্চি হেলাল, টিটন, ফ্রিডম সোহেল ও কিলার আব্বাস। খোরশেদ আলম ওরফে রাশু ২১ সেপ্টেম্বর জেল থেকে ছাড়া পেলেও ২৭ সেপ্টেম্বর ফের অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে। পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। মশিউর রহমান কচি, সুব্রত বাইন, আমিন রসুল সাগর, ইমাম হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, মোল্লা মাসুদ, শামীম আহমেদ, হারিস আহমেদ, তানভিরুল ইসলাম জয়, জাব্বার মুন্না, জাফর আহমেদ, জিসান, কামরুল হাসান হান্নান ওরফে ছোট হান্নান দেশের বাইরে অবস্থান করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে সহযোগীদের উদ্বুদ্ধ করছেন।

২০০৩ সালে মালিবাগের একটি হোটেলে ডিবি পুলিশের দুই সদস্যকে হত্যা করে জিসান বাহিনী। এরপর দুবাইয়ে আত্মগোপনে যায় জিসান। সেখান থেকেই সে এখন বেশ তৎপর। সুইডেন আসলাম ২৭ বছর ধরে আছেন কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে। ১৭ মামলার একটি ছাড়া বাকিগুলোয় জামিন পেয়েছেন তিনি। ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল প্রায় ২০ বছর ধরে কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা থাকলেও বেশির ভাগ মামলায় জামিন পেয়েছেন। মিরপুর ও কাফরুল এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস ২২ বছর ধরে কারাগারে আটক আছেন। তার বিরুদ্ধে থাকা ১১টি মামলার ১০টিতেই জামিন পেয়েছেন। শীর্ষ পর্যায়ের সন্ত্রাসী ঈদুল প্রায় ১৫ বছর ধরে কাশিমপুর কারাগারে। তার বিরুদ্ধে আটটি মামলা থাকলেও দুটি ছাড়া সবকটিতে জামিন পেয়েছেন। ফ্রিডম সোহেলের বিরুদ্ধে থাকা ১১টি মামলার মধ্যে ৯টিতেই জামিন হয়েছে। সন্ত্রাসী লম্বু সেলিম একটি মামলা ছাড়া সবকটিতেই জামিনে আছেন।

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে পেশাদার অপরাধীরা যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করাচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডেও অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা থেকে অস্ত্র পাঠাচ্ছে ভারতে পলাতকরা। অত্যাধুনিক ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে। কতিপয় রাজনীতিবিদ ও ছাত্রসংগঠনের নেতাদের হাতেও পৌঁছে গেছে এই অস্ত্র। এমনকি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের কাছে চলে যাচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক পিস্তল উদ্ধার করেছে। গত অক্টোবর টেকনাফের উনচিপ্রাং ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে তিনটি ওয়ান শুটারগান ও ১৪৬ রাউন্ড গুলিসহ তিন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে এপিবিএন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার মিসিমপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে অস্ত্র পাচার চেষ্টার সময় ১৭ সেপ্টেম্বর এক চোরাকারবারিকে পিস্তল, গুলিসহ গ্রেফতার করে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। ২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফের একটি বসতঘর থেকে তিনটি বিদেশি নাইন এমএম পিস্তল, একটি বিদেশি পিস্তল, ১৪১ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, তিনটি ম্যাগাজিনসহ বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ২৩ সেপ্টেম্বর যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা বাগআঁচড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুইটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটারগান, তিনটি রিভলবার, ম্যাগাজিন, ১৯ রাউন্ড গুলিসহ এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। গত মাসে পাহাড়ি অঞ্চল মৌলভীবাজারের কুলাউরায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদসহ ‘ইমাম মাহদুদের কাফেলা’ নামক জঙ্গি সংগঠনের ১০ জনকে গ্রেফতার করে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। ৭ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি পিস্তল, ১৫ রাউন্ড গুলিসহ আনসার আল ইসলামের নায়েবে আমিরসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বাড্ডা থানা এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, গুলিসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে বাড্ডা থানা পুলিশ।

গোপীবাগ-মতিঝিলের আতঙ্ক হিসাবে পরিচিত নাসির উদ্দিন ২৩ বছর পর ইতালি থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরেছে। আন্ডারগ্রাউন্ড সন্ত্রাসীদের কাছে সে ‘গোপীবাগের বস’ হিসাবে পরিচিত। খিলগাঁও এলাকায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রকাশ ও বিকাশ দায়িত্ব দিয়েছেন বোঁচা সাইফুলকে। ধলপুর, সায়েদাবাদ, গোলাপবাগ এলাকায় ভয়ংকর হয়ে উঠছে সজীব আহমেদ নামের এক নব্য সন্ত্রাসী।

সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সেকেন্ড ইন কমান্ড তারেক সাঈদ মামুন জামিন পান। এরপর আন্ডারওয়ার্ল্ডে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দেয়। এরই জেরে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিজি প্রেসের সামনের রাস্তায় তার প্রাইভেট কার লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। এতে ভুবন চন্দ্র শীল নামে একজন আইনজীবী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

র‌্যাব জানায়, ফোর মার্ডার মামলায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে থাকার পর গত জুনে জামিনে মুক্তি পায় সিরিয়াল কিলার সাগর আলী। এর তিন মাস পর ৩০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা করে সে। র‌্যাবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা অবস্থায় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির সঙ্গে সাগরের পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তার এক প্রতিপক্ষকে খুনের প্রস্তাব দেন সাগরকে। এই শর্তে রাজি হওয়ার পর সাগরের জামিনে সহায়তা করেন ওই ব্যক্তি।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা এবং অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, যেসব সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা চালাবে, তাদের সবাইকেই আইনের আওতায় আনা হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নির্বাচন সামনে রেখে উগ্রবাদীদের বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠলে তাদেরও প্রতিহত করা হবে বলে তিনি জানান।

র‌্যাব লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, কিছু ব্যক্তি বা মহল মনে করে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের জনসমর্থনের পাশাপাশি পেশিশক্তির প্রয়োজন আছে। তারা সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে অস্ত্রের ব্যবহারের চেষ্টা করে থাকতে পারে। এ বিষয়ে আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছেন। নির্বাচনের আগে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব পরিচালক বলেন, সম্প্রতি যারা জামিন পেয়েছেন, তাদের ওপরও আমাদের নজরদারি আছে।

পূর্বের খবরভালুকায় সাংবাদিকদের সাথে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মতবিনিময়
পরবর্তি খবরআটক ইসরাইলিদের মুক্ত করতে হামাসের সঙ্গে আলোচনা শুরু এরদোগানের