ডলার সংকট কাটছে না আরও ভোগাবে

দেশে ডলারের সংকট সহসাই কাটছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ সংকট চলতি অর্থবছরও থাকবে। ফলে ডলার, পণ্য ও জ্বালানিসহ অন্যান্য সেবার মূল্যবৃদ্ধির চাপ মূল্যস্ফীতিতে এ অর্থবছরও মোকাবিলা করতে হবে। এর প্রভাবে আমদানি পণ্যের দাম আরও বাড়বে। ফলে অন্যান্য পণ্যের দামেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে বিনিয়োগ খুব একটা বাড়বে না। এতে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হবে। আগের কর্মসংস্থান ধরে রাখাও হবে চ্যালেঞ্জিং। ডলারের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবগুলো চলতি অর্থবছরে আরও বেশি ভোগাবে। তবে আগামী অর্থবছর থেকে সংকট কমতে পারে।

গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ শুরু করলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। ওই সময় থেকেই দেশে আমদানি ব্যয় বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বেড়ে যায় জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব পণ্যের দাম। বাড়তে থাকে মূল্যস্ফীতির হার। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বছরের এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিতে ২৫ শতাংশ এলসি মার্জিন আরোপ করে। পরে ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে শতভাগ করা হয়। কেবলমাত্র খাদ্য, জ্বালানি, কৃষি, শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আমদানি ছাড়া বাকি সব পণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে গত সেপ্টেম্বর থেকে ডলারের সংস্থান ছাড়া কোনো এলসি খোলা যাচ্ছে না। ফলে এখন কেবলমাত্র যাদের ডলার আয় আছে যেমন-রপ্তানিকারক, কেবল তারাই এলসি খুলতে পারছেন। এর বাইরে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের কিছু বাড়তি ডলার দিয়ে সরকারি খাত ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। এছাড়া বাণিজ্যিক খাতে কোনো পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি খাতনির্ভর যেসব শিল্প দেশে গড়ে উঠেছিল সেগুলো এখন গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এর মধ্যে রড তৈরির কাঁচামাল স্ক্র্যাপ ভেসেল বা পুরোনো জাহাজ ৬১ শতাংশ, আয়রন ও স্টিল স্ক্র্যাপ ২০ শতাংশ, বিভিন্ন ধরনের মেটাল ৭১ শতাংশ, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল ১৪ শতাংশ, কটন ইয়ার্ন ৪০ শতাংশ আমদানি কমেছে। এমনকি রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও ১৬ শতাংশ কমেছে, এলসি খোলা কমেছে ৩৪ শতাংশ। বৈশ্বিক মন্দায় রফতানির আদেশ কম আসায় এ খাতে এলসি ও আমদানি কমেছে। এসব খাতে কর্মসংস্থান যেমন কমেছে, তেমনি জিডিপিতে অর্থের জোগানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ডলার সংকটে চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিলে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ১২ শতাংশ ও এলসি খোলা কমেছে ১৮ শতাংশ। শিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামালের এলসি ৩১ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ২৪ শতাংশ। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির এলসি ৩২ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ১০ শতাংশ। শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি ৫৭ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ১৭ শতাংশ। বিবিধ শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি কমেছে ৪৬ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ৩২ শতাংশ। অন্যান্য পণ্যের এলসি ২০ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ১ শতাংশের বেশি। তবে জ্বালানি তেল ও জ্বালানি খাতের উপকরণ আমদানির এলসি বেড়েছে আড়াই শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এর প্রভাবে শিল্প খাতে নেতিবাচক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উৎপাদন কমছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও নিম্নমুখী।

ডলার সংকট শিল্প খাত ছাড়াও দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের আঘাত করছে। এ আঘাতের মাত্রা ক্রমেই আরও স্পষ্ট হচ্ছে। ডলার সংকটের কারণে গত বছরের এপ্রিল থেকে এর দাম বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে এক ডলারের দাম ছিল ৮৪ টাকা। এখন তা বেড়ে ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা ছাড়িয়ে গেছে। দাম বেড়েছে ২৫ টাকা ৫০ পয়সা। বৃদ্ধির হার ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ দেড় বছরে টাকার মান কমেছে ৩০ শতাংশ। ডলারের এ মূল্যবৃদ্ধি সব শ্রেণির মানুষকে আঘাত করেছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় ওই আঘাত আরও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সংকট কাটাতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সরকার এখনো বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে পারেনি। কিন্তু ব্যয় কমিয়ে সংকট মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমাতে গিয়ে এখন আমদানি নিয়ন্ত্রণ করছে। দীর্ঘ সময় আমদানি নিয়ন্ত্রণের ফলে আমদানিনির্ভর যেসব শিল্প গড়ে উঠেছিল সেগুলো হুমকির মুখে পড়বে। এতে ওইসব খাতে খেলাপি ঋণ বাড়বে। কর্মসংস্থান কমবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটি খাতের প্রবৃদ্ধি একেবারেই নগণ্য। কিন্তু ব্যয়ের হিসাব অনেক বড় হচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি হচ্ছে। এ ঘাটতির কারণে ডলারের দাম বাড়ছে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও টান পড়ছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তার আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে কমেছিল ১৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ১৫ শতাংশ কমার পর বেড়েছে মাত্র পৌনে তিন শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল দুই হাজার ১০৩ কোটি ডলার। গত অর্থবছরে এসেছে দুই হাজার ১৬১ কোটি ডলার। এক বছরে রেমিট্যান্স বেড়েছে মাত্র ৫৮ কোটি ডলার। রপ্তানি আয় গত অর্থবছরে বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়েছিল ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ খাতের আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে নিট বৈদেশিক অনুদান বেড়েছিল ৫৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে কমেছে ২৩ শতাংশ। একই সঙ্গে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের ওই সময়ে এফডিআই এসেছিল ১৭৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে ১৬৪ কোটি ডলার।

সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমলেও বকেয়া আমদানির দেনা ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ মিলে প্রতি মাসে যে ডলারের সংস্থান হওয়া দরকার তা হচ্ছে না। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে ৭০০ কোটি ডলারের আয় হচ্ছে। এর বিপরীতে তাৎক্ষণিক আমদানির দেনা মেটাতে যাচ্ছে ৬৫০ কোটি ডলার। বকেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে আরও কমপক্ষে ১০০ কোটি ডলার। এ হিসাবে মাসে ঘাটতি ৫০ কোটি ডলার। এছাড়া বিদেশে বিভিন্ন সেবা, রয়্যালটি, মুনাফা প্রত্যাবাসনসহ সব মিলে আরও বাড়তি খরচ হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে ডলারের ঘাটতি হচ্ছে।

এদিকে আগে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে স্বল্পমেয়াদি দায় মেটানো হতো। এখন ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে। যে কারণে এখন ডলার সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ মান কমিয়ে দেওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ায় বিদেশ থেকে ঋণপ্রবাহ আরও কমবে। একই সঙ্গে বাড়বে খরচ। এতে ডলারের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ডলারের সংকট ধীরে ধীরে কমছে। আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরও কিছু দিন থাকবে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্য আমদানি করতে হলে ডলারের সংস্থান করতে হবে। করোনা ও বৈশ্বিক মন্দা শুরুর পর যেসব বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করা হয়েছিল সেগুলো এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।

পূর্বের খবরমেক্সিকোতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৮
পরবর্তি খবর‘তারেককে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে’